তুলনা নয়, খেয়াল: প্রতিটি শিশু নিজের গতিতে বড় হয়
যেকোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে কথাটা উঠবেই।
"ওর বয়সী ছেলেটা তো কত কথা বলে!" "তোমার মেয়ে এখনো নিজে খায় না?"
কথাগুলো সাধারণত খারাপ উদ্দেশ্যে বলা হয় না। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে বাবা-মায়ের মনে যে খচখচানিটা থেকে যায়, সেটা সত্যি — আর সেটা নিয়েই এই লেখা।
"স্বাভাবিক" একটা বিন্দু নয়, একটা বিস্তৃত পরিসর
শিশুর বিকাশ নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটা হলো — প্রতিটি দক্ষতার একটা নির্দিষ্ট বয়স আছে।
বাস্তবে প্রতিটি মাইলফলকের একটা পরিসর থাকে, আর সেটা অনেক চওড়া। এক বছরের ব্যবধানে দুই শিশু একই জিনিস শিখতে পারে, আর দুজনই পুরোপুরি স্বাভাবিক।
একটা শিশু আগে হাঁটে, আরেকটা আগে কথা বলে। পাঁচ বছর বয়সে এসে দুজনের পার্থক্য আর চোখেই পড়ে না।
তুলনা ভুল তথ্য দেয়
পাশের বাসার শিশুর সাথে তুলনা করে আপনি যা পান, সেটা আসলে একটা মাত্র উদাহরণ — আর সেটা যেকোনো দিকেই চরম হতে পারে।
তার চেয়েও বড় কথা, আপনি পুরোটা দেখছেন না। যে মেয়েটা গড়গড় করে কথা বলে, সে হয়তো এখনো সিঁড়ি ভাঙতে ভয় পায়। যে ছেলেটা দৌড়ে বেড়ায়, সে হয়তো রঙের নাম বলতে পারে না।
আমরা অন্যের শিশুর সবচেয়ে ভালো দিকটা দেখি, আর নিজের শিশুর সবটা দেখি। তুলনাটা তাই শুরু থেকেই অসম।
তাহলে চেকলিস্ট কেন?
প্রশ্নটা ন্যায্য। পরিসর যদি এত চওড়া হয়, তালিকা দিয়ে লাভ কী?
পার্থক্যটা উদ্দেশ্যে।
তুলনার জন্য ব্যবহার করলে চেকলিস্ট হয়ে যায় একটা পরীক্ষা — পাস বা ফেল। সেটা কারো কাজে আসে না।
খেয়াল রাখার জন্য ব্যবহার করলে এটা হয়ে যায় একটা মানচিত্র। কোন জায়গায় শিশু সাবলীল, কোন জায়গায় একটু বেশি সুযোগ দিলে ভালো হয় — সেটা দেখিয়ে দেয়।
একটা ঘরে টিক না পড়া মানে ব্যর্থতা নয়। মানে হলো "এই জিনিসটা এখনো আসেনি" — আর বেশিরভাগ সময় সেটা কয়েক মাসের মধ্যেই চলে আসে।
চেকলিস্ট কাজে লাগানোর তিনটা ভালো নিয়ম
এক — নিজের শিশুর সাথে নিজের শিশুকে মেলান। তিন মাস আগে কী পারত, এখন কী পারে? এই তুলনাটাই একমাত্র কাজের তুলনা।
দুই — একটা ঘর নয়, পুরো ছবিটা দেখুন। একটা জিনিস দেরিতে আসা আর একটা পুরো ক্ষেত্র পিছিয়ে থাকা — এক নয়। দ্বিতীয়টাই খেয়াল করার বিষয়।
তিন — শিশুর সামনে টিক দেবেন না। এটা আপনার নজর রাখার হাতিয়ার, ওর মূল্যায়নের কাগজ নয়।
দুশ্চিন্তা নিজেও শিশুর উপর প্রভাব ফেলে
একটা দিক নিয়ে কম কথা হয়।
শিশুরা আমাদের উদ্বেগ টের পায়। যে খাওয়াটা টেনশনের হয়ে ওঠে, যে পড়তে বসাটা পরীক্ষার মতো লাগে — শিশু সেটা এড়াতে শুরু করে।
শিশু যখন নিরাপদ আর স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, তখনই সবচেয়ে ভালো শেখে। তাই নিজের দুশ্চিন্তা সামলানোটাও ওর বিকাশের অংশ — আলাদা কিছু নয়।
তাহলে কখন সত্যিই সতর্ক হবেন
"প্রতিটি শিশু আলাদা" — কথাটা সত্যি, কিন্তু এটা সব উদ্বেগ উড়িয়ে দেওয়ার কারণ নয়।
নিচের বিষয়গুলো অপেক্ষা করার মতো নয়। এগুলো দেখলে শিশু বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন:
- আগে পারত এমন কোনো দক্ষতা হারিয়ে ফেলা — বয়স যাই হোক, এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ
- একটা পুরো ক্ষেত্র বয়সের তুলনায় অনেক পিছিয়ে থাকা
- নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেওয়া, বা চোখে চোখ না রাখা
- অন্য শিশুদের সাথে একেবারেই মিশতে না পারা
আর এর বাইরেও একটা কারণ যথেষ্ট: আপনার মনে হচ্ছে কিছু একটা ঠিক নেই। বাবা-মায়েরা সাধারণত সবার আগে টের পান, আর সেই অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
একবার দেখিয়ে নেওয়ায় কোনো ক্ষতি নেই। হয় কিছু পাওয়া যাবে না আর আপনি নিশ্চিন্ত হবেন, নয়তো তাড়াতাড়ি সাহায্য শুরু হবে। দুটোই ভালো ফল।
এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়।