KinderStepকিন্ডারস্টেপ

শিশু দেরিতে কথা বলছে? কখন অপেক্ষা করবেন, কখন ডাক্তার দেখাবেন

"পাশের বাসার মেয়েটা তো দুই বছরেই গড়গড় করে বলে, আমার ছেলে তিন বছরে এখনো অল্প কথা বলে।"

এই দুশ্চিন্তাটা খুব সাধারণ। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত কিছুই হয় না — শিশু নিজের সময়ে কথা বলা শুরু করে।

কিন্তু "বেশিরভাগ ক্ষেত্রে" মানে সব ক্ষেত্রে নয়। তাই কখন অপেক্ষা করা যায় আর কখন একবার দেখিয়ে নেওয়া উচিত, সেই পার্থক্যটা জানা থাকা দরকার।

আগে একটা জিনিস পরিষ্কার করে নিই

শিশুরা দুই রকম ভাষা একসাথে শেখে — বোঝা আর বলা।

অনেক শিশু সব বোঝে, নির্দেশনা মানে, নাম ধরে ডাকলে তাকায়, ইশারায় সব বুঝিয়ে দেয় — কিন্তু মুখে শব্দ কম। আবার কিছু শিশুর বোঝার দিকেও সমস্যা থাকে।

এই দুটো এক জিনিস নয়, আর দ্বিতীয়টা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শিশু বুঝতে পারছে কি না — সেটাই আগে খেয়াল করুন।

তিন বছরে সাধারণত যা দেখা যায়

এই বয়সে বেশিরভাগ শিশু:

  • দুই-তিন শব্দের বাক্যে কথা বলে
  • নিজের নাম আর বয়স বলতে পারে
  • পরিবারের লোকজন ওর বেশিরভাগ কথা বুঝতে পারে

শেষের পয়েন্টটা কাজের মাপকাঠি। পরিবারের মানুষ যদি ওর কথার বেশিরভাগ বুঝতে পারে, সেটা ভালো লক্ষণ — উচ্চারণ পুরোপুরি স্পষ্ট না হলেও।

যেগুলো আসলে দুশ্চিন্তার কারণ নয়

  • একটু দেরিতে শুরু করা। কিছু শিশু দেরিতে শুরু করে, তারপর দ্রুত এগিয়ে যায়।
  • দুই ভাষার সংসার। বাসায় বাংলা আর ইংরেজি দুটোই চললে শিশু কখনো একটু পরে শুরু করে, কিন্তু দুই ভাষা শেখা কোনো সমস্যা তৈরি করে না। মোট শব্দভান্ডার দুই ভাষা মিলিয়ে হিসাব করতে হয় — শুধু একটা গুনলে কম মনে হবে।
  • ছেলে বলে দেরি — এটা প্রচলিত কথা, কিন্তু অপেক্ষা করার কারণ হিসেবে যথেষ্ট নয়।
  • বড় ভাইবোন সব বলে দেয়। চাহিদা পূরণ হয়ে গেলে কথা বলার তাগিদ কমে।

যে লক্ষণগুলো দেখলে বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন

নিচের যেকোনোটি দেখলে অপেক্ষা না করে শিশু বিশেষজ্ঞ বা স্পিচ থেরাপিস্টের সাথে কথা বলুন:

  • আগে পারত এমন কোনো শব্দ বা দক্ষতা হারিয়ে ফেলেছে — এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ, বয়স যাই হোক
  • নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় না, বা শোনা নিয়ে সন্দেহ হয়
  • সহজ নির্দেশনা বোঝে না ("জুতাটা আনো")
  • চোখে চোখ রাখে না, ইশারা করে না, হাত দিয়ে দেখায় না
  • তিন বছরেও শব্দ জোড়া দিয়ে কিছু বলছে না
  • পরিবারের লোকজনও ওর কথা বুঝতে পারছে না

শোনার পরীক্ষাটা আগে করিয়ে নিন। ভাষা দেরিতে আসার একটি সাধারণ কারণ হলো কানে কম শোনা, আর সেটা অনেক সময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না।

ঘরে আজ থেকেই যা করতে পারেন

ব্যয়বহুল কিছু লাগে না। যেটা লাগে সেটা হলো নিয়মিত সময়।

  • দিনে অন্তত ১০ মিনিট চোখে চোখ রেখে কথা বলুন। ফোন হাতে নয়।
  • ও যা বলে, একটু বড় করে ফিরিয়ে বলুন। ও বলল "গাড়ি" — আপনি বলুন "হ্যাঁ, লাল গাড়ি যাচ্ছে।"
  • প্রশ্নের জায়গায় অপেক্ষা করুন। জিজ্ঞেস করে অন্তত পাঁচ সেকেন্ড চুপ থাকুন। শিশুদের উত্তর গোছাতে সময় লাগে।
  • সব চাওয়া ইশারাতেই পূরণ করবেন না। আঙুল দেখালে বুঝেও একবার জিজ্ঞেস করুন, "কোনটা চাও?"
  • একসাথে ছবির বই দেখুন। পড়ে শোনানোর চেয়ে ছবি নিয়ে কথা বলাই বেশি কাজে দেয় — "এটা কী? ও কী করছে?"
  • স্ক্রিনের সময় কমান। স্ক্রিন থেকে ভাষা শেখা হয় না, কারণ ভাষা শিখতে পাল্টাপাল্টি কথা দরকার।

অপেক্ষা করাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি

অনেকে বলেন "আরেকটু দেখুন, সময় হলে বলবে।" অনেক সময় কথাটা ঠিকও হয়।

কিন্তু যদি সত্যিই কোনো সাহায্যের দরকার থাকে, তাড়াতাড়ি শুরু করলে ফল অনেক ভালো হয়। একবার দেখিয়ে নেওয়ায় কোনো ক্ষতি নেই — আর কিছু না পাওয়া গেলে অন্তত দুশ্চিন্তাটা কমে।

এই লেখাটি কোনো রোগ নির্ণয় নয়। আপনার শিশুকে নিয়ে কিছু মনে হলে, সেই অনুভূতিটাকে গুরুত্ব দিন — বাবা-মায়েরা সাধারণত আগে টের পান।